বীর মুক্তিযোদ্ধা স্টাইলিশ আইকন নায়ক ও গায়ক জাফর ইকবাল । জাফর ইকবাল ছিলেন একজন বাংলাদেশী অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী। তিনি আশির দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। জাফর ইকবালের বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ ও ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ দুজনেই সংগীতশিল্পী।
জাফর ইকবাল ১৯৬৬ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে গঠন করেন ব্যান্ড গ্রুপ ‘র্যাম্বলিং স্টোন’ এবং তার সিনেমায় প্রথম প্লে-ব্যাক করা গান ছিল তার ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ ছবিতে প্রথম গান করেন ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও/আমি তো এখন আর নই কারও’। জাফর ইকবাল এর কণ্ঠে "হয় যদি বদনাম হোক আরো " গানটি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় প্রথম প্লেব্যাকেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান এই অভিনেতা। এরপর সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাঁকে দিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ অন্যতম। নিজের কণ্ঠে ‘কেন তুমি কাঁদালে’ শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যুগে ‘সুখে থাকো নন্দিনী’ গানটি গেয়ে দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর উদ্যাপন বিশেষ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন ‘এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে’ গানটি।
জাফর ইকবাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন
বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের অন্যতম জাফর ইকবাল । তিনি চিরসবুজ নায়ক হিসেবে পরিচিত[১]। শহুরে রোমান্টিক ও রাগী তরুণের ভূমিকায় দারুণ মানালেও সব ধরনের চরিত্রে ছিল তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অভিনয়ের পাশাপাশি চমৎকার গান গাইতে পারা এ অভিনেতা বেশকিছু ছবিতে গায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে আনোয়ার পারভেজের সুরে রাজ্জাক অভিনীত বদনাম ছবিতে 'হয় যদি বদনাম হোক আরও’ তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম। মূলত তিনি ছিলেন গিটারবাদক। ভালো গিটার বাজাতেন বলে সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাকে দিয়ে অনেক ছবির আবহসংগীত তৈরি করিয়েছেন। তার সেই ছবিগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে জাফর ইকবাল চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। তার অভিনীত প্রথম ছবির নাম আপন পর। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন কবরী। জাফর ইকবালের সাথে অভিনেত্রী ববিতা জুটি হয়ে প্রায় ৩০টির মত ছবি করেন। সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ১৫০টি ছবি করেন।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন জাফর ইকবাল। ‘সূর্যসংগ্রাম’ ও এর সিকুয়াল ‘সূর্যস্বাধীন’ চলচ্চিত্রে ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেন। ১৯৭৫ সালে ‘মাস্তান’ চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় তাকে সে প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশা থেকে বিপথগামী তরুণের চরিত্রে তিনি ছিলেন পরিচালকদের অন্যতম পছন্দ। সামাজিক প্রেমকাহিনী ‘মাস্তানে’র নায়ক জাফর ইকবাল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রে এক গ্রামীণ তরুণের চরিত্রেও দর্শক তাকে গ্রহণ করে।
জাফর ইকবাল ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসা সফল। ১৯৮৯ সালে জাফর ইকবাল অভিনীত ত্রিভূজ প্রেমের ছবি ‘অবুঝ হৃদয়’ দারুণ ব্যবসা সফল হয়। এ ছবিতে চম্পা ও ববিতার বিপরীতে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। ববিতার সঙ্গে তার জুটি ছিল দর্শক নন্দিত। এই জুটির বাস্তব জীবনে প্রেম চলছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ায় হতাশ হয়েই জাফর ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছিল। ববিতার বিপরীতে ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। জাফর ইকবাল অভিনীত ‘ভাই বন্ধু’, ‘চোরের বউ’, ‘অবদান’, ‘সাধারণ মেয়ে’, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, ‘ফকির মজনুশাহ’, ‘দিনের পর দিন’, ‘বেদ্বীন’, ‘অংশীদার’, ‘মেঘবিজলী বাদল’, ‘সাত রাজার ধন’, ‘আশীর্বাদ’, ‘অপমান’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘নয়নের আলো’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘প্রেমিক’, ‘নবাব’, ‘প্রতিরোধ’, ‘ফুলের মালা’, ‘সিআইডি’, ‘মর্যাদা’ ,‘সন্ধি’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র সুপারহিট হয়।
নায়ক জাফর ইকবাল সনিয়া নামে একজনকে বিয়ে করেন । তাদের দুই সন্তান রয়েছে। পারিবারিক অশান্তির কারণে জাফর ইকবাল মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। পরবর্তীকালে মদ্য পানসহ অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের ফলে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তার হার্ট এবং কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। ৮ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন
আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিস আইকন কিংবদন্তী চিত্রনায়ক ও কণ্ঠশিল্পী জাফর ইকবাল ভাই।
কালের বিবর্তনে আমরা অনেক অগ্রজ কিংবদন্তীকেভুলে গিয়েছি।এটা আমাদের ব্যার্থতা কারন যেই অগ্রজ'গন আমাদের পথ চলতে শিখিয়েছে,সামনের দিকে এগুতে সহযোগীতা করেছে,সামনে এগিয়ে যাবার কন্টকময় দূর্গম অচেনা পথ পাড়িদিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে,আমরা তাদের কথা একটি বারও মনে করিনা। এটাই হলো বর্তমান সময়ে মানবিক অবক্ষয় এর প্রধান অন্তরায়।বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে আজ অব্ধি জাফর ইকবাল এর মতো ফ্যাশন সেন্স রুচিসম্পন্ন একজন নায়কও আসেনি।
সেই ৭০ এর দশকে তিনি যেই ড্রেসআপ পড়তো সেটা তখনকার ইয়াং জেনারেশনের কাছে ছিলো আইকনিক ব্যাপার।তখন বাংলা চলচ্চিত্রে অন্যান্য নায়কগন সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত তাদের সবার চাইতে কিন্তুু তখনকার তরুনদের পছন্দের একমাত্র মধ্যমনি ছিলো জাফর ইকবাল ভাই।এই গুনি মানুষটির কথা চলচ্চিত্র পাড়ার সকলেই প্রায় ভুলে গিয়েছে। কিন্তুু একটি কথা আমি অকোপটেই বলতে পারি ৮০-৯০ পরবর্তী যতো নায়কেরা স্টাইল করতো তারা সকলেই কিন্তুু জাফর ইকবাল ভাইকে অনুকরন করতো।প্রয়াত স্বপ্নের নায়ক সালমান শাহ্ বলতো আমি আমার চলচ্চিত্রের আইডল মানি জাফর ইকবাল ভাইকে।
আজ এই গুনি মানুষটির শুভ জন্মদিন সুদর্শন ও স্টাইলিস চিত্রনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর ইকবাল ভাই।জাফর ইকবাল ভাইয়ের সাথে অসংখ্য কাজের অনবদ্য স্মৃতি।আমি এবং জাফরইকবাল জুটি হিসেবে ১৬ টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি এবং এর বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই সুপারহিট বাম্পারহিট।বিনম্র শ্রদ্ধা ও অনেক ভালোবাসা জাফর ভাই আপনার প্রতি আপনার শূন্যস্থান কোনদিন পূর্ন হবার নয়,আপনার স্থানে কেউ কখনো আসতে পারিনি,আর ভবিষ্যতও আসতে পারবে না।আপনার তুলনা শুধুই আপনি।আপনার অনবদ্য কাজের মাধ্যমে অনন্তকাল আপনি চীর অমর হয়ে রয়ে যাবেন,বাংলা সিনেমা প্রেমী দর্শকের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে।
বাংলা ছবির ‘এলভিস প্রিসলি’
কে বেশি স্টাইলিশ? কে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন পরবর্তী নায়কদের? এমন বাহাস এলেই অবধারিতভাবে দুটি নামকে তুলনা করা হয়—জাফর ইকবাল নাকি সালমান শাহ? জাফর ইকবাল চলচ্চিত্রে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আগে, ১৯৭০ সালে। অভিনয় করেছেন দেড় শ ছবিতে। আর সালমান শাহর ক্যারিয়ার শুরুই হয়েছে ১৯৯৩ সালে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ২৭টি ছবিতে কাজ করতে পেরেছেন তিনি।
দীর্ঘ ২৩ বছরের ব্যবধান দুজনের। বয়সে নয়, চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতায়। দুজনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। সময়, অভিনয় দক্ষতা, ফ্যাশন স্টেটমেন্ট—সবকিছুতে বিস্তর ফারাক। তবু কেন তুলনা এ দুজনের মধ্যে? কারণ, সালমান শাহর আষ্টেপৃষ্ঠে তকমা দেগে দেওয়া হয়েছে—স্টাইলিশ আইকন। এ তকমার আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর অভিনয় দক্ষতা। আজকের দিনে অনেকেই সালমান শাহর নামের সঙ্গে শুধু ভালো সাজপোশাক, কমপ্লিট ইন, মাথায় বাঁধা রুমাল, দামি কেডস, সানগ্লাস—এসব বিষয় জুড়ে দেন।
যাঁরা প্রমাণ করতে চান সালমান শাহ থেকেই ঢাকাই ছবি ফ্যাশন-সচেতনতা শিখেছে, তাঁরা নিশ্চয়ই খুব ভুল জানেন। তাঁরা নিশ্চয়ই জাফর ইকবালকে ভুলে গেছেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নামটিকে ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে বাদ দেওয়ার একটা পাঁয়তারা এটি। সালমান শাহর প্রভাব পরবর্তী নায়কদের মধ্যে দারুণভাবে পড়েছে, এটা সত্যি। আত্মহত্যার ঘটনার পর মিডিয়ার ফোকাস সালমানের দিকে পড়েছে, এখনো পড়ছে, এটাও বাস্তবতা।
কিন্তু তাতে জাফর ইকবালের নামটি কোনোভাবেই ডি-ফোকাসড হওয়ার কথা নয়। অথচ সেটাই হয়েছে। এফডিসির অনুষ্ঠানে, পরিচালকের বয়ানে, নায়ক-নায়িকার শোডাউনে, পত্রিকার গালভরা ইন্টারভিউয়ে—কোথাও আর অত বড় করে ‘জাফর ইকবাল’ নামটি খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ তিনি দেড় শ সফল ছবির নায়ক। বাংলা ছবিকে ‘স্টাইলিশ’ করে তোলার পেছনে তাঁর অবদান কম নয়।
হাসানঅভিজাত পরিবারের ছেলে জাফর ইকবাল। ঢাকার গুলশানে তাঁর জন্ম। জাফর ইকবালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। এক স্মৃতিচারণায় কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘জাফর ইকবাল দারুণ স্মার্ট ছিলেন। শুধু পোশাক-আশাকে না, ওর রুচিবোধ, ইন্টেলেকচুয়াল হাইট, ফ্যাশন-সচেতনতা—সবই ছিল নজরকাড়ার মতো। এই অঙ্গনে আর কারও মধ্যে এ রকম দেখিনি। আমি নিজেই দেখেছি তার বাসার ‘শু’ র র্যাকে তিন শ রকমের জুতা। জুতা রাখার আলাদা একটা কর্নার ছিল। জুতার সঙ্গে মিল রেখে ড্রেস পরতেন। এখনকার কোনো নায়কের মধ্যেও এমন ফ্যাশন-সচেতনতা আছে কি না, জানি না।’
গান ছিল জাফর ইকবালের প্রথম প্রেম। ছোট থেকেই সুরে-তালে বড় হয়েছেন। দারুণ পছন্দ করতেন সময়ের আরেক কিংবদন্তি এলভিস প্রিসলিকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই জাফর ইকবাল বন্ধুদের নিয়ে শুরু করেছিলেন ব্যান্ড দল ‘রোলিং স্টোন’। ভালো গিটার বাজাতেন তিনি। ভালো গাইতেন। অভিনয় শুরুর আগে গায়ক হিসেবেই পরিচিতি ছিল জাফর ইকবালের।
প্রথম প্লেব্যাক ‘বদনাম’ ছবিতে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও, আমি তো এখন আর নই কারও।’ এরপর সুরকার আলাউদ্দীন আলী তাঁকে দিয়ে অসংখ্য ছবিতে কাজ করিয়েছিলেন। ‘তুমি কেন কাঁদালে’ নাম দিয়ে একটি অডিও অ্যালবাম বের করেছিলেন জাফর ইকবাল, আশির দশকের মাঝামাঝি।
চলচ্চিত্রে যখন প্রবেশ করেন তিনি, ওই সময়টা মোটেই সুবিধাজনক ছিল না। ছিল কঠিন প্রতিযোগিতা। নামকরা অনেক নায়কের ছবি তখন প্রতি সপ্তাহেই মুক্তি পাচ্ছে। হইহই করে চলছে সেসব। এর মধ্যে নবাগত জাফর ইকবাল নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আলাদাভাবে। সত্তর ও আশি দশকে পর্দায় রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণাপীড়িত তরুণের চরিত্রে পরিচালকদের আস্থা ছিলেন তিনি।
ববিতার সঙ্গে জাফর ইকবালের জুটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রচুর গুঞ্জন শোনা যেত সে সময়—তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে। অনেকেই বলেন, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী, হয়ে কারও ঘরনী’ গানটি তিনি ববিতার উদ্দেশেই গেয়েছিলেন! সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন জাফর ইকবাল, এমন কথাও বলেন অনেকে। খুব অভিমানী এবং আবেগপ্রবণ ছিলেন। স্বভাবে বোহিমিয়ান। খানিকটা রাগী। জীবনযাপনে কিছুটা অগোছালো।
এম হাসানজাফর ইকবালের শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘লক্ষ্মীর সংসার’। এ ছবির একটি দৃশ্যে তিনি ঢাকায় নতুন আসেন। কিচ্ছু চেনেন না। একে-ওকে প্রশ্ন করে আজিমপুর যাওয়ার রাস্তা খুঁজছিলেন। দৃশ্যটি খুব সাধারণ, কিন্তু অর্থবহ। কারণ, ‘লক্ষ্মীর সংসার’ মুক্তির এক মাসের মাথায় শরীর-মনে নানা রোগে ভুগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন জাফর ইকবাল। সেই আজিমপুর কবরস্থানই হয় তাঁর শেষ আশ্রয়!
আজ ৮ জানুয়ারি, বাংলা ছবির এই কিংবদন্তি রকস্টারের প্রয়াণদিবস। প্রিয় শিল্পী ও অভিনেতা এলভিস প্রিসলির জন্মদিনেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি। ঢাকাই চলচ্চিত্র জাফর ইকবালকে আরও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে, তাঁকে মূল্যায়ন করবে—এ আশা তো করাই যায়।
আইকনিক নায়ক-গায়ক জাফর ইকবাল
বাংলা সিনেমার স্টাইলিশ নায়কদের তালিকার প্রথমদিকের একজন অভিনেতার নাম জাফর ইকবাল। ৭০ ও ৮০’র দশকে দর্শকদের মনে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন অনেকটা নীরবেই চলে যায় তার জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী।
বাংলা সিনেমার স্টাইলিশ নায়কদের তালিকার প্রথমদিকের একজন অভিনেতার নাম জাফর ইকবাল। ৭০ ও ৮০'র দশকে দর্শকদের মনে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন অনেকটা নীরবেই চলে যায় তার জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী।
আজ আইকনিক নায়ক জাফর ইকবালের জন্মদিন। ১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বোন কণ্ঠশিল্পী শাহানাজ রহমতুল্লাহ এবং বড় ভাই সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ। তাদের কেউই আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই।
খ্যাতিমান অভিনেত্রী ববিতা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, 'তার অনেক বিষয় আমাকে মুগ্ধ করতো। সে যেমন ছিল সুদর্শন, অভিনয়ে ছিল সাবলীল, তার কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব, ফ্যাশন সচেতনতা, রুচিবোধ সবকিছু দারুণ। খুব ভালো ইংরেজি গান গাইতে পারতো। গিটার বাজিয়ে ওর কণ্ঠে ইংরেজি গান শোনাটা সেই সময়ে স্বপ্নের একটি মুহূর্তের মতো। তার মতো সম্পূর্ণ নায়ক আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে খুব কম।'
সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বয়সে আমার বড় হলেও বন্ধুর মতো মিশতাম তার সঙ্গে। একজন ফ্যাশন আইকন ছিলেন তিনি। তার ফ্যাশন আমরা অনুসরণ করতাম সেই সময়ে। রুচিবোধ থেকে শুরু করে তার ব্যক্তিত্ব ছিল নজরকাড়া। প্রেমিক নামের একটি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন জাফর ভাই। সেখানে আমাকে অভিনয় করতে বলেছিলেন। সারারাত ধরে তার ধানমন্ডির বাসায় বুঝিয়েছিলেন অভিনয় করার বিষয়ে। যদিও শেষ পর্যন্ত অভিনয় করা হয়নি। মেয়েরা তাকে অনেক পছন্দ করতো। খুব সচেতন হয়ে ড্রেসআপ করতেন। তার লিপে আমার কণ্ঠের অসংখ্য গান ব্যবহার হয়েছে।'
জাফর ইকবাল অভিনীত প্রথম সিনেমার নাম 'আপন পর'। খান আতাউর রহমান পরিচালনা করেছিলেন ছবিটি। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে তার নায়িকা ছিলেন কবরী। এই ছবির 'যা রে যাবি যদি যা' গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায় সেই সময়ে। ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে 'সূর্য সংগ্রাম' ছবিতে ববিতার বিপরীতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া 'মাস্তান' ছবির বদৌলতে ড্যাশিং নায়কের পরিচিতি পান জাফর ইকবাল। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পরিচিতি পান 'নয়নের আলো' সিনেমার মাধ্যমে।
সর্বমোট ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জাফর ইকবাল। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য কিছু সিনেমা হলো- অবুঝ হৃদয়, ভাই বন্ধু, অবদান, প্রেমিক, সাধারণ মেয়ে, ফকির মজনু শাহ, দিনের পর দিন, বেদ্বীন, অংশীদার, মেঘ বিজলী বাদল, নয়নের আলো, সাত রাজার ধন, আশীর্বাদ, অপমান, এক মুঠো ভাত, গৃহলক্ষ্মী, ওগো বিদেশিনী, প্রেমিক, নবাব, প্রতিরোধ, ফুলের মালা, সিআইডি, মর্যাদা, সন্ধি, বন্ধু আমার, উসিলা ইত্যাদি।
ববিতার সঙ্গে জুটি হয়ে ৩০টি সিনেমায় অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। বাস্তব জীবনে এই জুটির প্রেমের কথা সেইসময় আলোচনা হতো। তবে ব্যক্তিজীবনে জাফর ইকবাল বিয়ে করেছিলেন সোনিয়া নামের একজনকে। এই দম্পতির দুই ছেলে সন্তান রয়েছে।
গায়ক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বন্ধুদের নিয়ে 'রোলিং স্টোন' ব্যান্ড গড়েছিলেন। এলভিস প্রিসলি তার খুব প্রিয় ছিল। সংগীত পরিচালক ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে 'বদনাম' ছবির 'হয় যদি বদনাম হোক আরও' গানটি দিয়ে চলচ্চিত্র প্লেব্যাকে অভিষেক হয় তার। সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সুরে অনেক গান গেয়েছেন তিনি। তার গাওয়া শ্রোতা প্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে 'সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারো ঘরনি', 'তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন', 'হয় যদি বদনাম হোক আরও'। ৮০'র দশকে 'কেন তুমি কাঁদালে' শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছিল তার।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে 'এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে' গানটি গেয়েছিলেন জাফর ইকবাল। পরে রফিকুল আলমও এই গানটি গেয়েছিলেন।
নায়ক, গায়ক, মুক্তিযোদ্ধা জাফর ইকবাল অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৯১ সালে ২৭ এপ্রিল মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন