পাক বাংলার রুপসী অভিনেত্রী জীবন্ত কিংবদন্তী শবনম ঘোষ ঝর্নার আত্মজীবনী
১৯৭৮ সালের ১৩ মে পাকিস্তানের সবচেয়ে আলোচিত হাই প্রোফাইলড ঘটনা ছিল উর্দু ছবির বিখ্যাত নায়িকা শবনমের গ্যাং রেপ। যা পাকিস্তান ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। লাহোরের পশ গুলবার্গ এলাকায় রবিন ঘোষ-শবনম দম্পতির বাড়িতে এক মর্মান্তিক অগ্নিপরীক্ষার শিকার হয়েছিলেন তাঁরা। সাত অস্ত্রধারী শবনমের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা সারাবাড়ি ঘুরে ডাকাতি করে। বাড়িতে ছিল কয়েকটি আলমিরা। যেখানে শবনমের মূল্যবান সব শাড়ি ড্রেস ছিল। রুপালি পর্দায় শবনমের পরনে যেসব ঝলমলে শাড়ি দেখা যেত, সেগুলো বস্তায় ঢুকিয়ে নেয় সাতজনের সশস্ত্র ডাকাতদল। তারপর বহুমূল্যের সোনার অলংকার লুটপাট করে। নগদ টাকাও নেয় তারা। বিখ্যাত সুরকার রবিন ঘোষ ডাকাতদল দেখে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন। তিনি ডাকাতদের বললেন, ‘আমার যা যা আছে সব তোমরা নিয়ে যাও। কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করোনা। আমার শিশুবাচ্চা ভয় পাবে’! তাদের ছেলে রনি ঘোষের বয়স তখন সম্ভবত সাত আট বছর ছিল।
ঝর্ণা বসাক (জন্ম: ১৭ আগস্ট, ১৯৪৬) বাংলাদেশের প্রখ্যাত নায়িকা ও অভিনেত্রী। যিনি শবনম নামে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।[২][৩] শবনম নামের অর্থ দাঁড়ায় ফুলের মধ্যে বিন্দু বিন্দু শিশির ঝরে পড়া। তিনি একজন হিন্দু অভিনেত্রী হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে বা ললিউডে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০'র দশক পর্যন্ত একাধারে সক্রিয় অভিনয় চর্চা করে গেছেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বা ঢালিউডে অভিনয় করে যাচ্ছেন। ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী শবনম ঐ সময়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম - উভয় অংশেই সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন।
১৭ আগস্ট, ১৯৪০ইং সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।[৪] বাবা ননী বসাক ছিলেন একজন স্কাউট প্রশিক্ষক ও ফুটবল রেফারী। স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক রবিন ঘোষ-কে শবনম বিয়ে করেন ১৯৬৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর।[৫] ২০১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে গুলশানের নিজ বাসভবনে বার্ধ্যক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন রবীন ঘোষ তাদের সংসারে একটি পুত্র সন্তান রয়েছে, নাম রনি ঘোষ।[৬] তার একমাত্র বড় বোন নন্দিতা দাস বর্তমানে ভারতের কলকাতার সিমলা রোডে বাস করছেন।[৭]
শৈশবেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখেছিলেন শবনম। একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে তিনি সুপরিচিতি লাভ করেন। সেখানেই একটি নৃত্যের অনুষ্ঠানে এহতেশাম তার নাচ দেখে এদেশ তোমার আমার চলচ্চিত্রের নৃত্যে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। তিনি আরও কিছু ছবিতে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। কিন্তু এহতেশামের পাশাপাশি পরিচালক মুস্তাফিজের নজর কাড়তে সক্ষম হন অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেই। মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শবনম। এ ছবিতেই তিনি শবনম নাম ধারণ করেন।
১৯৬১ সালে বাংলা চলচ্চিত্র হারানো দিনের মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম।[৮] ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র চান্দা ছবির মাধ্যমে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান।[৯] এ দু'টি ছবিই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল।[১০] পরবর্তী বছরে তালাশ সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ঐ সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসা সফল ছবির মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। পেশাজীবি মনোভাবের কারণে তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচীতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন। সত্তর দশকের শুরুতে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। তিনি নায়িকা হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধ্বস নামার পূর্বে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবতঃ বিশ্বে তিনিই একমাত্র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী যিনি ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছিলেন।
শবনম আয়না ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং ছবিটি পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলোতে দীর্ঘদিন যাবৎ চলার রেকর্ড করে। ১৯৬০-এর দশকে কাজী রিজভানী'র পরিচালনায় ওয়াহিদ মুরাদের বিপরীতে লাদলা ছবির সোচা থা পিয়ার না করেংগে গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায় এবং সেই সাথে তিনিও সকলের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হন।
ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে শবনম-রহমান জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান থেকে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে এসে আরো কিছু বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন