লাল দুর্গের অতন্দ্র প্রহরী নট, নাট্যকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত
শিশির-উত্তর বাংলা রঙ্গমঞ্চের বিস্ময় ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ভিলেন এবং কৌতুকাভিনেতা উৎপল দত্তকে নিয়ে লিখেছেন সুদেষ্ণা বসুশিশির-উত্তর বাংলা রঙ্গমঞ্চের বিস্ময় ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ভিলেন এবং কৌতুকাভিনেতা উৎপল দত্তকে নিয়ে লিখেছেন সুদেষ্ণা বসু
বাংলা তথা ভারতের নাট্যসমাজের এক আশ্চর্য, তুলনাহীন ব্যক্তিত্বের নাম উৎপল দত্ত। তিনি যে কেবল নট, নাট্যকার, নির্দেশক, গবেষক, চিন্তাবিদ বা কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রচারক ছিলেন, তা নয়। তাঁর সব কিছুকে নিয়ে ভারতীয় নাট্যজগতে যে বিপুল আলোড়ন উঠেছিল, তাঁর সময়কালে আর কোনও নাট্যব্যক্তিত্বকে ঘিরে তেমনটা হয়নি। তাঁর মতো আগে কেউ ছিলেন না, পরেও কেউ আসেননি। পুলিশি নির্যাতন, কারাবাস, দুষ্কতীদের দিয়ে তাঁর নাটকের উপর আক্রমণ... কোনও কিছুই থামাতে পারেনি সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত এই নাট্যব্যক্তিত্বকে।
ছেলেবেলা
পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ, বাংলাদেশের বরিশাল জেলার কীর্তনখোলায়। যদিও তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল কুমিল্লা জেলায়। কিন্তু তিনি নিজে তাঁর জন্মস্থান শিলংয়ে তাঁর মামার বাড়িতে বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। তাই সঠিক বলা দুষ্কর আসল জন্মস্থানটি কোথায়। উৎপলের বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা রায়ের (দত্ত) পাঁচ পুত্র, তিন কন্যার মধ্যে উৎপল ছিলেন চতুর্থ সন্তান। পারিবারিক ধর্মগুরু তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন শঙ্কর। বাবা গিরিজারঞ্জন ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষ। তিনি পরবর্তী কালে জেলার হিসেবে ইংরেজ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক (কমান্ড্যান্ট) নিযুক্ত হন।
উৎপলের স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল শিলং শহরের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে। পরে গিরিজাশঙ্কর বদলি হয়ে আসেন বহরমপুর শহরে। এখানেই উৎপলের ছেলেবেলার দিনগুলো কেটেছিল। ছোট ভাই নীলিন ও তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বিপ্লবীদের ভয়ে স্কুলে যাতায়াতের সময়ে তাঁদের সঙ্গে দেহরক্ষী থাকত। জেলের পাঠান রেজিমেন্টের জওয়ানদের সঙ্গে উৎপল ড্রিল করতেন। এই সঙ্গই তাঁকে সময়ানুবর্তিতা শিখিয়েছিল। জেল-সংলগ্ন কোয়ার্টারে সপরিবার তাঁরা থাকতেন। বাড়ির সদর দরজায় মা শৈলবালার হাতে তৈরি এমব্রময়ডারি করা শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের পেমেনিয়াসের সংলাপ ঝুলত, ‘নেভার কোয়ারেল, নেভার লেন্ড অর বরো ইফ ইউ আর অনেস্ট।’ বোঝাই যায়, বাড়িতে পাশ্চাত্য শিক্ষার পরিবেশে শেক্সপিয়রের উপস্থিতি ছিল অগ্রগণ্য। মেজদা মিহিররঞ্জন কিশোর উৎপলকে শেক্সপিয়রের নাটকের গল্প পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাটক শোনার চল ছিল। উৎপল সে সব নাটক মন দিয়ে শুনতেন। তাই তিনি মাত্র ছ’বছর বয়সেই শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলতে পারতেন। বড়দিদির মাধ্যমে হিন্দুস্তানী মার্গ সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় বহরমপুরের বাড়িতেই। আরও পরে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেন। তখনও নাটক তাঁকে টানেনি। তিনি চেয়েছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট হতে। কিন্তু শিক্ষিকা মিসেস গ্রিনহল তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর হাতের আঙুলের দৈর্ঘ্য বা ‘রিচ’ কম হওয়ায় তাঁর পক্ষে কনসার্ট পিয়ানিস্ট হওয়া সম্ভব নয়
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ
১৯৩৯ সালে গিরিজাশঙ্কর কলকাতায় বদলি হলে দত্ত পরিবার দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত রয় স্ট্রিটে থাকতে শুরু করেন। কলকাতায় আসার পরেই উৎপল বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতার পেশাদার থিয়েটার দেখতে শুরু করেন। তিনি লিখেছেন, “মহেন্দ্র গুপ্তের পরিচালনায় স্টার থিয়েটারের প্রযোজনার আমি তো রীতিমতো ভক্ত ছিলাম। আর অবশ্যই শিশির ভাদুড়ী মহাশয়ের শ্রীরঙ্গমের অভিনয়গুলি। নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে তাঁর অভিনয় লক্ষ্য করতাম। সেইসব মহৎ কারবার দেখে মনে হল, আমার পক্ষে অভিনেতা ছাড়া আর কিছুই হবার নেই। আমার বয়স তখন তেরো।”
বিশ্ব জুড়ে তখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সেই আবহাওয়ায় দশ বছর বয়সের উৎপল ভর্তি হলেন সেন্ট লরেন্স স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে। তাঁকে দেখে সহপাঠী, পরে অধ্যাপক, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের মনে হয়েছিল, ‘গ্যালিভার’-এর পাতা থেকে যেন এক অতিমানব এসে হানা দিয়েছিল তাঁদের স্কুলে। স্কুলে বিদেশি নাটক হত। উৎপল অভিনয় করতেন। এর পরে তিনি চলে আসেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে, নবম শ্রেণিতে। এই স্কুল ও কলেজ জীবন উৎপল দত্তকে তৈরি করে দিয়েছিল। ১৯৪৫-এ তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। কলেজে তাঁর কাছে সবচেয়ে আকর্ষক ছিল গ্রন্থাগারটি। বিভিন্ন বিষয়ের বই তাঁর সামনে মেলে ধরেছিল জ্ঞানের বিপুল ভাণ্ডার। বন্ধু পুরুষোত্তম লালের ভাষায়, “উৎপল হল বর্ন ব্রিলিয়ান্ট। ওই বয়সেই সে শেক্সপিয়রের জগৎকে যেমন আবিষ্কার করেছিল, তেমনই মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন, হেগেল, কান্টও তাঁর আয়ত্তে ছিল।”
জিয়োফ্রে কেন্ডালের দলের সঙ্গে (পিছনের সারিতে ডান দিক থেকে তৃতীয়)
কলেজে ইউরোপীয় নাট্যচর্চার একটা ধারা আগে থেকেই সজীব ছিল। এখানে পড়াকালীনই এক দিকে যেমন ইবসেন বা শেক্সপিয়রের নাটকের জগৎ তাঁর আরও কাছে এসেছিল, তেমনই সেই নাটকে অভিনয় করার নেশা। কলেজ পত্রিকার জন্য তিনি ‘বেটি বেলশাজ়ার’ নামে প্রথম ইংরেজি নাটকটি লিখেছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়েও লিখতে শুরু করেন। সেখানে যেমন ছিল শেক্সপিয়র, বার্ট্রান্ড রাসেল, রুশ সাহিত্য, তেমনই রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র... আবার বেঠোভেন, বাখ, শুবার্ট ও ভাগনারের মতো সুরস্রষ্টারাও বাদ যাননি। পরবর্তী কালে তাই থিয়েটারে সংলাপের পরে সঙ্গীতের প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।
১৯৪৭ সালে নিকোলাই গোগোলের ‘ডায়মন্ড কাট্স ডায়মন্ড’-এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে কলেজজীবনে উৎপলের নাট্য অভিনয়ের শুরু। তাঁর সহপাঠী অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন প্রতাপ রায়, অনিল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এই বন্ধুদের নিয়েই তিনি তৈরি করেন তাঁর প্রথম নাট্যদল ‘দি অ্যামেচার শেক্সপিরিয়নস’। তখন তাঁর বয়স আঠেরো। যদিও ইতিমধ্যে ১৯৪৪ সালে ‘নবনাট্য আন্দোলন’-এর জন্ম দেওয়া ‘নবান্ন’ নাটকটি তিনি দেখেছেন ও চমকে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি তাঁর নিজের বৃত্তেই তখন তৈরি হচ্ছিলেন সেই নবনাট্যর এক স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করার জন্য।
কারণ, দিন বদলের দামামা উৎপল তত দিনে শুনে ফেলেছিলেন। তাঁর কলেজ জীবনের সময় কালে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর চারের দশক জুড়ে বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা, উদ্বাস্তুদের ঢল, গণনাট্য, কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়া, নৌ-বিদ্রোহ ইত্যাদিতে সারা দেশ উত্তাল। সেই রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবেশ উৎপলকে বাধ্য করেছিল তত্ত্বগত ভাবে আয়ত্তে থাকা মার্ক্সের দর্শনকে নাট্যমঞ্চে প্রয়োগের স্তরে নিয়ে আসতে। ১৫ জুলাই ’৪৯ জেভিয়ার্সের মঞ্চে তিনি শেক্সপিয়রের ‘জুলিয়াস সিজ়ার’ উপস্থাপন করলেন চরিত্রদের ইতালীয় ফ্যাসিস্ত শাসকের পোশাক পরিয়ে। সমকালীন মাত্রা পেল শেক্সপিয়রের নাটক।
জিয়োফ্রে কেন্ডাল ও শেক্সপিয়রানা নাট্যদল সেন্ট জেভিয়ার্সে থাকাকালীনই শেক্সপিয়রের ‘রিচার্ড দ্য থার্ড’-এ উৎপলের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের দলে টেনে নেন জিয়োফ্রে কেন্ডাল। ‘দ্য শেক্সপিয়রানা ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানি’তে অভিনেতা হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন উৎপল। প্রথম পর্বে কলকাতা ও দ্বিতীয় পর্বে সারা দেশ ঘুরে তিনি এই দলের পেশাদার অভিনেতা হিসেবে শেক্সপিয়রের মোট আটটি নাটকে অভিনয় করেন। জিয়োফ্রেকে শিক্ষাগুরু মনে করতেন উৎপল। শেক্সপিয়রের নাটকে ঠিক কী ভাবে অভিনয় করতে হয়, নাটকের দল বলতেই বা কী বোঝায়, তা তাঁকে হাতেকলমে শিখিয়েছিলেন জিয়োফ্রে। শোভা সেনের লেখা থেকে জানা যায়, এই নাট্যদলে কাজ করার সময়ে জেনিফার কেন্ডালের প্রেমে পড়েছিলেন উৎপল। কিন্তু সে সম্পর্ক বেশি দিন টেকেনি। জেনিফারকে এক জন ক্ষমতাময়ী অভিনেত্রী বলে মনে করতেন উৎপল। তাই পরবর্তী জীবনে শশী কপূরের সঙ্গে জেনিফারের বিয়ে ও অভিনয় ছেড়ে দেওয়ায় খুব দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি।
গণনাট্য সংঘ
শেক্সপিয়রানা দলের হয়ে অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের ‘দ্য অ্যামেচার শেক্সপিরিয়ানস’ নাট্যদলের হয়েও অভিনয় করে যাচ্ছিলেন উৎপল। ১৯৪৯ সালে এই দলের নাম বদলে হয় ‘কিউব’। ১৯৫০-এ ইউরোপ ও আমেরিকার গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আবারও দলের নাম বদলে করেন ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’। ১৯৫২ সালে এই দলে যোগ দেন রবি ঘোষ, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারা। এর পরই বাংলা নাটকের দল হিসেবে ‘এল টি জি’ পাকাপাকি ভাবে আত্মপ্রকাশ করে হেনরিক ইবসেনের বাংলা অনুবাদ ‘গোস্টস্’ নাটকটি দিয়ে। এক সময়ে উৎপল দত্ত গণনাট্য সংঘেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সম্পর্ক মাত্র আট (মতান্তরে দশ) মাস স্থায়ী হয়েছিল। গণনাট্যের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আরও অনেকের মতো বিরক্ত হয়ে তিনিও বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু গণনাট্যই তাঁকে শিল্পে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রথম পাঠ শিখিয়েছিল। উচ্চবিত্ত পারিবারিক পটভূমি, ইঙ্গবঙ্গীয় থিয়েটারের অভিজ্ঞতা, কেতাদুরস্ত ইংরেজি, ইউরোপীয় পাণ্ডিত্যে ভরপুর আপাদমস্তক ‘সাহেব’ নাট্য পরিচালক ও নট উৎপল তাঁর যাবতীয় প্রজ্ঞা ও প্রতিভা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সর্বহারা মানুষের মাঝখানে। সেখান থেকে জীবনে আর কখনও বিচ্যুত হননি। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে থেকেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন লাল দুর্গের এক অতন্দ্র প্রহরী। গণনাট্য সংঘের হয়ে তিনি পানু পালের ‘ভাঙা বন্দর’, ইবসেনের ‘পুতুলের সংসার’, রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’, গোগোলের ‘রেভিজর’ অবলম্বনে ‘অফিসার’, উমানাথ ভট্টাচার্যর ‘চার্জশীট’, পানু পালের ‘ভোটের ভেট’, ঋত্বিক ঘটকের ‘দলিল’ ও শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
এল টি জি প্রতিষ্ঠা ও পথনাটক
উৎপল দত্ত হলেন বাংলা পথনাটকের পথিকৃৎ। তাঁর মতে, “পথনাটিকা হচ্ছে সেই মাধ্যম যেখানে লক্ষ মেহনতী মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ও অভিনেতার রাজনৈতিক উপলব্ধি এক হয়ে বিস্ফোরিত হয় মঞ্চে।” সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক শ্রেণির হাত ধরেই এর উঠে আসা। ১৯৫১ সালে উমানাথ ভট্টাচার্যের এক রাতের মধ্যে লেখা ‘চার্জশীট’ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম পথনাটক। যা অভিনীত হয়েছিল হাজরা পার্কে। যেখানে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটক, মমতাজ আহমেদ ও পানু পাল। ১৯৫২ সালে ‘পাসপোর্ট’ থেকে ১৯৯২ সালে ‘সত্তরের দশক’ পর্যন্ত দীর্ঘ একচল্লিশ বছরে উৎপল দত্ত মোট ২৫টি পথনাটক করেছিলেন কখনও কোনও কারখানার গেটে, নির্বাচনী জনসভায় বা বন্দিমুক্তি আন্দোলনে উত্তাল বাংলার বিভিন্ন মাঠে ময়দানে। এই প্রযোজনাগুলি হয়েছিল গণনাট্য ও ‘উৎপল দত্ত সম্প্রদায়’-এর নামে। পথনাটকে অভিনয়ের সুযোগ তাঁকে করে দিয়েছিল গণনাট্য সংঘ।
মিনার্ভা, উত্তাল সময়
এই সময়কাল উৎপল দত্তর জীবনে গোত্র বদলের কাল। মানুষের মুখরিত সখ্যে নেমে আসছেন তিনি। আর সেই উদ্দেশ্যেই পেশাদার নাট্যমঞ্চ গড়ে নিয়মিত থিয়েটার করে যাওয়ার বাসনায় মিনার্ভা থিয়েটার লিজ় নিয়ে প্রতি বৃহস্পতি, শনি ও রবিবার থিয়েটার করতে শুরু করেছিলেন। প্রথম দিকে আগে অভিনীত ‘ওথেলো’, ‘ছায়ানট’ ও ‘নীচের মহল’ দিয়ে শুরু হলেও পেশাদার নাট্যমঞ্চের দর্শক তেমন ভাবে সাড়া দেয়নি। কিন্তু তারই মধ্যে ঘটেছিল এক আশ্চর্য যোগাযোগ। ‘নীচের মহল’ নাটকের অভিনয় হচ্ছে মিনার্ভায়। দর্শক সংখ্যা খুবই নগণ্য। নাটকের শেষে মুগ্ধ রবিশঙ্কর দর্শকাসন থেকে উঠে এসে বলেছিলেন, “আমি আপনাদের পরের নাটকে সঙ্গীত দিতে চাই, নেবেন?” এ প্রস্তাব যেন মরা গাঙে জোয়ার এনেছিল।
এই সময়ে উৎপল দত্তর ব্যক্তিগত জীবনও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত। মিনার্ভা হলের তিনতলার ঘরটাই ছিল তাঁর বাসস্থান। তত দিনে পেশাদার অভিনেতা হওয়ার তাগিদে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের চাকরিটিও ছেড়েছেন। অন্য দিকে সহ-অভিনেতা শোভা সেনের সঙ্গে তাঁর স্বামী দেবপ্রসাদ সেনের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। যার প্রভাব পড়ছিল উৎপল দত্তর জীবনেও। পরবর্তী কালে উৎপল ও শোভা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৬১-তে জন্মায় তাঁদের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া।
হার না মানার পণ নিয়ে
এল টি জির সদস্যরা মিনার্ভা ও অন্যান্য মঞ্চে নাটক করে যাচ্ছিলেন। এমনই এক সময়ে ধানবাদ অঞ্চলের জামাডোবায় চিনাকুড়ি ও বড়াধেমো কয়লাখনিতে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। খাদে আগুন ধরে যায়। মালিক আটকে পড়া শ্রমিকদের কথা না ভেবে জল ঢুকিয়ে খনি বাঁচাতে চেষ্টা করেন। শ্রমিকরা মারা যান। এই দুর্ঘটনার খবর রবি ঘোষ তাঁর এক আত্মীয় মারফত নিয়ে আসেন উৎপলের কাছে। খবর পেয়েই তিনি ছুটে যান সেই কয়লাখনিতে। সঙ্গে তাপস সেন, নির্মল গুহরায়, উমানাথ ভটাচার্য, রবি চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ। হাজার ফুট নীচের সেই খনিগহ্বরে তাঁরা দু’ঘণ্টা ধরে ঘুরে বেড়ান। জীবিত খনি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন। খনির ভিতরের বিভিন্ন শব্দ রেকর্ড করেন। তার পরে সেখান থেকে ফিরে মিনার্ভার তিনতলার ঘরে বসে টানা ১৫ দিনে লিখে ফেলেন কালজয়ী নাটক ‘অঙ্গার’। ১৯৫৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই নাটক প্রযোজনার কাহিনি আজ বাংলা নাট্যজগতে মিথে পরিণত হয়েছে। এর পরে এল টি জি নাট্যদলকে আর পিছনে ফিরতে হয়নি। উৎপল দত্ত তার পর থেকে ‘গ্যালিভার’-এর মতোই বিচরণ করেছেন বাংলার নাট্যজগতে।
এই ভাবেই ক্রমশ মিনার্ভায় ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’ ‘প্রোফেসর মামলক’ ইত্যাদি নাটক পার হয়ে ১৯৬৫ সালের ২৮ মার্চ মঞ্চস্থ হয়েছিল আর এক সাড়া জাগানো নাটক ‘কল্লোল’। ১৯৪৬-এর নৌ-বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে এই নাটক বিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশকে যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের সূচনা করেছিল, তা আজও নজিরবিহীন। উৎপল দত্তের বয়স তখন ৩৬।
কারাবাস
স্বাভাবিক কারণেই ‘কল্লোল’-এর বিরুদ্ধে সরকারি ক্রোধ নেমে এসেছিল। পত্রপত্রিকা ও সংবাদপত্রে নাটকটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বলা হয়েছিল, মিনার্ভা থিয়েটার ‘কমিউনিস্টদের বেলেল্লাপনার আখড়া’য় পরিণত হয়েছে। এই নাটকের বিজ্ঞাপন ছাপা নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন কলকাতার প্রায় সব খবরের কাগজ। কিন্তু তাপস সেনের করা ‘কল্লোল চলছে চলবে’ পোস্টার ও মন্মথ রায়, সত্যজিৎ রায় প্রমুখের পাঠানো প্রতিবাদপত্রে নাটকের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত রক্ষা আইনে উৎপল দত্তকে গ্রেফতার করে জেলবন্দি করা হয়। তাঁর মুক্তির দাবিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরে সরব হয়েছিলেন শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা। কলকাতার রাস্তায় মিছিল বেরিয়েছিল। তাঁর মুক্তির পর ৭ মে ১৯৬৬ ময়দানে আয়োজিত হয়েছিল ‘কল্লোল বিজয় উৎসব’।
নকশাল আন্দোলন, ‘তীর’ নাটক, মুচলেকা
নকশাল আন্দোলন উৎপল দত্তকে আগ্রহী করেছিল। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বামপন্থী মহল প্রশ্ন তুলেছিল। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে বর্জন করেছিলেন। আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা হিসেবে উৎপল আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। আজীবন মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও দায়বদ্ধ শিল্পী নকশাল রাজনীতির জোয়ারে ভেসে গিয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালের ‘তীর’ নাটক যার ফলশ্রুতি। তিনি আবারও সরকারি নজরদারির আওতায় চলে আসেন। তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তাঁকে আত্মগোপন করতে হয়। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুম্বই শহর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। একটি ‘আর্মস ডিল’-এর সূত্রে তিনি নাকি মুম্বই গিয়েছিলেন। তখন ইসমাইল মার্চেন্টের ‘গুরু’ ছবিরও কাজ চলছিল। সেই শুটিংয়ের আড়ালে পার্টির জন্য ওই আর্মস ডিলের কাজ করছিলেন তিনি। তাজ হোটেল থেকেই স্বেচ্ছায় ধরা দেন উৎপল। কিন্তু বন্দি হয়ে জেলে বসে থাকলে তাঁর পক্ষে শুটিং চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না। অনেক টাকার ক্ষতিপূরণও দিতে হত। সেই অবস্থা এড়াতে ইসমাইল মার্চেন্ট সরকারি উচ্চমহলে যোগাযোগ করে অভিনেতার জামিনের ব্যবস্থা করেন। জামিন পাওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁকে মুচলেকা দিতে হয় যে, তিনি আর কখনও কোনও রকম রাজনৈতিক নাটক লিখবেন না ও করবেন না। অবশ্য তাও তিনি বাকি জীবনে রাজনৈতিক নাটক লেখা ও মঞ্চস্থ করা থেকে বিরত হননি।
পি এল টি
নকশাল রাজনীতি থেকে পরে নিজেকে সরিয়ে নিলেও উৎপল দত্ত জীবনের ওই পর্বে ছিলেন রাজনৈতিক ভাবে নিঃসঙ্গ। নিজের দল এল টি জি তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। সেই নিঃসঙ্গতা ও সংকট মুহূর্তে তিনি মঞ্চস্থ করেন ‘মানুষের অধিকার’ নামে আরও একটি কালজয়ী নাটক। যদিও এই নাটক নকশালপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অতি-বামদের বৈরিতা শুরু হয়। তার প্রভাব এসে পড়ে এল টি জি দলের মধ্যে। সাত সদস্য দলত্যাগ করেন। উপদলের জন্ম হয়। ফলে ১১ বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া একটি অন্যধারার পেশাদার থিয়েটারের ইতি ঘটিয়ে উৎপল দত্ত মিনার্ভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। গড়ে তোলেন ‘বিবেক নাট্যসমাজ’, যা পরবর্তী কালে নতুন দল ‘পিপলস লিটল থিয়েটার’ বা ‘পি এল টি’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর রবীন্দ্র সদনে অভিনীত হয় দলের প্রথম নাটক ‘টিনের তলোয়ার’। এই নাটকে বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসটি সুন্দর ভাবে ধরা পড়লেও ‘অশ্লীল’ ঘোষিত হওয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর পরে ‘সূর্যশিকার’, ‘ব্যারিকেড’, ‘টোটা’, ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’, ‘তিতুমীর’, ‘স্তালিন ১৯৩৪’, ‘লালদুর্গ’, ‘জনতার আফিম’ পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন ‘একলা চলো রে’ নাটকে। যে নাটকে তিনি শেষ বারের মতো মঞ্চে নামেন।
রাজনৈতিক যাত্রাপালা
রবি ঘোষের মতে, উৎপল দত্তর জীবন জুড়ে আছে আরও এক বিশেষ অধ্যায়, তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপালা। ব্রেখট ভক্ত উৎপলের কাছে যাত্রা ছিল মানুষের মাঝে পৌঁছনোর সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। শহুরে প্রোসেনিয়াম ছেড়ে তিনি যেমন রাস্তায় নেমে এসে নাটক করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তেমনই যাত্রার মঞ্চকে ব্যবহার করে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে মানুষের রাজনৈতিক চেতনা বাড়াতে চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায় পা রেখেছিলেন। নিউ আর্য অপেরার হয়ে ‘রাইফেল’ পালার মধ্য দিয়ে তিনি পেশাদার পালাকার ও পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি সফল পালাকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একচ্ছত্র অধিপতি।
চলচ্চিত্র
“নাটক ও যাত্রা আমাকে সৃষ্টির আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্র দিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ, মানে টাকা। হিন্দি চলচ্চিত্র আমাকে সর্বভারতীয় অভিনেতা হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল।” মধু বসুর ‘মাইকেল’ ছবিতে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উৎপল দত্তর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা। অসংখ্য বাংলা ও হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করলেও তাঁর নিজের ভাললাগার ছবিগুলি তৈরি হয়েছিল অজয় কর, তরুণ মজুমদার, তপন সিংহ, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, শক্তি সামন্তর মতো পরিচালকের ছবি দিয়ে। তিনি যে কত বড় কৌতুকাভিনেতা, তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে এঁদের ছবিতে। আবার মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের ছবিতে তাঁর অভিনয় একেবারে অন্য গোত্রের। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ তাঁকে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। তবে যাঁর ছবিকে তিনি বারবার কুর্নিশ করেছেন প্রথম থেকেই, তিনি সত্যজিৎ রায়। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎকে লেখা তাঁর আবেগরুদ্ধ চিঠি রয়েছে। সত্যজিৎকে তিনি ডাকতেন ‘স্যর’ বলে। সত্যজিৎও মুগ্ধ ছিলেন উৎপলের প্রতিভায়। বলেছিলেন, ‘উৎপল যদি রাজি না হত, তবে হয়তো আমি ‘আগন্তুক’ বানাতামই না।’ ‘আগন্তুক’ ছবিতে উৎপলকে নিজের প্রতিভূ হিসেবেই ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ।
জীবনসন্ধ্যা, প্রয়াণ
নট, নাট্যকারের স্তর থেকে উৎপল দত্ত ক্রমশ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের সেরা শেক্সপিয়র বিশেষজ্ঞদের অন্যতম ও এক জন প্রগতিশীল বামপন্থী চিন্তাবিদের পর্যায়ে। বাংলা নাটকে যেমন মাইকেলকে নতুন ভাবে এনেছিলেন গিরীশ ঘোষ, তেমনই বার্টোল্ড ব্রেখটকে যুক্ত করেছিলেন উৎপল দত্ত। নিজেই বলেছেন, তাঁর উপরে প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল, সোভিয়েত রাশিয়ার নিকোলে পাভলোভিচ অখলোপকভ-এর। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সিনেমা নয়, তাঁর আসল জাত চিনিয়েছে নাটক। “নির্দেশক উৎপল দত্তর কর্মকাণ্ড শিশির-উত্তর বাংলা রঙ্গমঞ্চকে যতখানি সমৃদ্ধ করেছে, ইতিহাসই সেই অতুলনীয় সম্পদের কোষাগার হয়ে থাকবে।” উৎপল দত্তের সঙ্গে নাটকে কাজ করতে চেয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন সৌমিত্র। আন্তন শেফারের ‘স্লিউথ’ নাটকটি তাঁকে অনুবাদ করতে দেন উৎপল। কথা ছিল, ওই নাটকে দু’জনে অভিনয় করবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। পরে সেই নাটক ‘টিকটিকি’ নামে সৌমিত্র করেছিলেন কৌশিক সেনের সঙ্গে।
উৎপল দত্তের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে নাটক, চলচ্চিত্র ও যাত্রার অনেক অভিনেতা ও পরিচালকের মনে। কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার মনে হত, “মহলার সময় বাবা যেন এক যুদ্ধের সেনানায়ক।” অভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ তাঁকে গুরু মানতেন। রবি ঘোষ বলতেন, “উৎপল দত্ত ছিলেন সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ ‘স্টেজ স্টলওয়ার্ট’। স্টেজ প্রোডাকশনের এ টু জ়েড জানতেন। আমার অভিনয়ের বেসিক ট্রেনিং তো ওঁর কাছেই পাওয়া।”
তরুণ মজুমদারের মনে আছে, “ওঁর ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির রায় সাহেবের চরিত্রটা এত পছন্দ হয়েছিল যে, এগ্রিমেন্ট পেপারে সই করে পারিশ্রমিকের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। ফ্লোরে মেকআপ নিয়ে পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হতেন। হাতে থাকত মোটা মোটা বই। শটের ফাঁকে পড়তেন। ডাক পড়লেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘ইয়েস স্যর’।”
মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়াকে ঠাট্টা করে তিনি বলেছিলেন, “ষাট বছর বয়স হলে বিপ্লবী আর বিপ্লবী থাকে না। প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যায়।” ১৯৯৩ সালের
উৎপল দত্ত (শুনুনⓘ; 29 মার্চ 1929 - 19 আগস্ট 1993) একজন ভারতীয় অভিনেতা, পরিচালক এবং লেখক-নাট্যকার ছিলেন। তিনি প্রাথমিকভাবে বাংলা থিয়েটারের একজন অভিনেতা ছিলেন, যেখানে তিনি আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের একজন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন, যখন তিনি 1949 সালে "লিটল থিয়েটার গ্রুপ" প্রতিষ্ঠা করেন। "এপিক থিয়েটার" সময়কাল, এটি অত্যন্ত রাজনৈতিক এবং উগ্র থিয়েটারে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করার আগে। তাঁর নাটকগুলি তাঁর মার্কসবাদী মতাদর্শের প্রকাশের জন্য একটি উপযুক্ত বাহন হয়ে ওঠে, যা কল্লোল (1965), মানুষের অধিকার, লৌহ মনোব (1964), টিনের তোলোয়ার এবং মহা-বিদ্রোহের মতো সামাজিক-রাজনৈতিক নাটকগুলিতে দৃশ্যমান। তিনি 40 বছরের ক্যারিয়ারে 100 টিরও বেশি বাংলা এবং হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং মৃণাল সেনের ভুবন শোম (1969), সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক (1991), গৌতম ঘোষের পদ্মা নাদির মাঝি (1992) এর মতো চলচ্চিত্রে তার ভূমিকার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। ) এবং হৃষিকেশ মুখার্জির হিন্দি কমেডি যেমন গোল মাল (1979) এবং রং বিরাঙ্গি (1983)।[1][2][3][4] 1993 সালে দূরদর্শনে ব্যোমকেশ বক্সীর (টিভি সিরিজ) সীমান্ত হীরার পর্বে তিনি একজন ভাস্কর স্যার দিগিন্দ্র নারায়ণের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, তার মৃত্যুর কিছু আগে।
তিনি 1970 সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং তিনটি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ান পুরস্কার পান। 1990 সালে, ভারতের ন্যাশনাল একাডেমি অফ মিউজিক, ড্যান্স অ্যান্ড থিয়েটার, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি তাকে তার সর্বোচ্চ পুরস্কার, থিয়েটারে আজীবন অবদানের জন্য সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ প্রদান করে।
প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা
উৎপল দত্ত ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ বরিশালে এক বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা গিরিজারঞ্জন দত্ত। সেন্ট এডমন্ডস স্কুল, শিলং-এ প্রাথমিক শিক্ষার পর, তিনি 1945 সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। তিনি 1949 সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে স্নাতক হন।
কর্মজীবন
যদিও তিনি প্রাথমিকভাবে বাংলা থিয়েটারে সক্রিয় ছিলেন, তবে তিনি ইংরেজি থিয়েটারে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। 1940-এর দশকে একজন কিশোর হিসাবে, তিনি ইংরেজি থিয়েটারে তার আবেগ এবং নৈপুণ্য বিকাশ করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ 1947 সালে "দ্য শেক্সপিয়ার্স" প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রথম অভিনয়টি ছিল শেক্সপিয়রের রিচার্ড III এর একটি শক্তিশালী প্রযোজনা, যেখানে দত্ত রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এটি জিওফ্রে কেন্ডাল এবং লরা কেন্ডাল (অভিনেত্রী জেনিফার কেন্ডালের পিতামাতা) কে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে "শেক্সপিয়ারানা থিয়েটার কোম্পানি" এর নেতৃত্বে তারা অবিলম্বে তাকে নিয়োগ দেয় এবং তিনি তাদের সাথে ভারত ও পাকিস্তান জুড়ে দুই বছর ব্যাপী সফর করেন, শেক্সপিয়রের রচয়িতা। নাটক, প্রথম 1947-49 এবং পরে 1953-54; এবং ছিল
ওথেলোর তার আবেগপূর্ণ চিত্রায়নের জন্য প্রশংসিত। 1949 সালে কেন্ডালরা প্রথমবার ভারত ত্যাগ করার পর, উৎপল দত্ত তার গ্রুপের নাম পরিবর্তন করে "লিটল থিয়েটার গ্রুপ" (এলটিজি) রাখেন এবং পরবর্তী তিন বছর ধরে ইবসেন, শ, ঠাকুর, গোর্কি এবং কনস্ট্যান্টিনের নাটক প্রদর্শন ও প্রযোজনা চালিয়ে যান। সিমোনভ। দলটি পরবর্তীতে একচেটিয়াভাবে বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অবশেষে একটি প্রযোজনা সংস্থায় পরিণত হয় যা বেশ কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে। এছাড়াও তিনি গণনাট্য সংঘের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন, যেটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় অনুষ্ঠান করে।
তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ) এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন, এটি একটি বামপন্থী ঝোঁকের জন্য পরিচিত একটি সংগঠন, কিন্তু কয়েক বছর পর যখন তিনি তার থিয়েটার গ্রুপ শুরু করেন তখন তিনি এটি ছেড়ে দেন। তিনি বাংলায় আলোচনা ও পরিবর্তন আনতে বার্টোল্ট ব্রেখটের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি শব্দটিকে "এপিক থিয়েটার" নামে অভিহিত করেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। 1948 সালে গঠিত তাঁর ব্রেখট সোসাইটি, সত্যজিৎ রায়ের সভাপতিত্বে। তিনি গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। দর্শকদের থিয়েটারের "সহ-লেখক" বলে ব্রেখটের বিশ্বাসকে গ্রহণ করার সময়, তিনি "এপিক থিয়েটার" এর গোঁড়ামিকে ভারতে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ইংরেজির শিক্ষকও ছিলেন।
শীঘ্রই তিনি তার স্থানীয় বাংলায় ফিরে যাবেন, বেশ কয়েকটি শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডি এবং রাশিয়ান ক্লাসিস্টদের কাজ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। 1954 সালে শুরু করে, তিনি বিতর্কিত বাংলা রাজনৈতিক নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন, এবং 1957 সালে ম্যাক্সিম গোর্কির লোয়ার ডেপথস বাংলায়। 1959 সালে, এলটিজি কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারের ইজারা পায়, যেখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে আঙ্গার (কয়লা) (1959) ভিত্তিক। কয়লা-খনি শ্রমিকদের শোষণের উপর প্রদর্শন করা হয়েছিল। পরের দশকে দলটি এখানে বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করে, একজন ইমপ্রেসারিও হিসেবে, এবং তাকে এখনও ভারতীয় থিয়েটারের শেষ অগ্রগামী অভিনেতা-ব্যবস্থাপকদের একজন হিসাবে স্মরণ করা হয়। তিনি আরজো অপেরা এবং বিবেক যাত্রা সমাজের মতো দলও গঠন করেন।
এদিকে, ওথেলো চরিত্রে অভিনয় করার সময় চলচ্চিত্রে তার স্থানান্তর ঘটেছিল, যখন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মধু বোস দেখতে পেয়েছিলেন, এবং তাকে তার চলচ্চিত্র মাইকেল মধুসূদন (1950) তে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা বিপ্লবী ভারতীয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল। . পরে, তিনি নিজেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের খণ্ডিত ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং "ঔপনিবেশিক" প্রশংসা এবং "ঔপনিবেশিক বিরোধী" বিদ্রোহের মধ্যে দোলা দেওয়ার দ্বিধা নিয়ে একটি নাটক লিখেছিলেন। তিনি সত্যজিৎ রায়ের অনেক চলচ্চিত্র সহ অনেক বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
দত্ত হিন্দি সিনেমার একজন অত্যন্ত বিখ্যাত কমিক অভিনেতাও ছিলেন, যদিও তিনি মাত্র কয়েকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি কমেডি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গুড্ডি, গোল মাল, নরম গরম, রং বিরঙ্গি এবং শওকিন। গোলমাল, নারম গরম এবং রং বিরঙ্গির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার সেরা কমেডিয়ান পুরস্কার পান। তিনি ভুবন শোমে (যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন), এক আধুরি কাহানি এবং কোরাস, সবই মৃণাল সেন-এ উপস্থিত হয়েছিলেন; সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক, জন অরণ্য, জয় বাবা ফেলুনাথ এবং হীরক রাজার দেশে; গৌতম ঘোষের পাড় ও পদ্মা নাদির মাঝি; জেমস আইভরি দ্বারা বোম্বে টকি, গুরু, এবং শেক্সপিয়র ওয়ালাহ; ঋত্বিক ঘটকের লেখা জুক্তি তক্কো আর গপ্পো; হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের গুড্ডি, গোল মাল এবং কোতোয়াল সাব; বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত শৌকিন, প্রিয়তমা এবং হামারি বহু অলকা এবং অমানুষ, আনন্দ আশ্রম এবং শক্তি সামন্তের বারসাত কি এক রাত।
উৎপল দত্ত অমিতাভ বচ্চন অভিনীত দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার, ইনকিলাব (চলচ্চিত্র) এবং দ্বিভাষিক হিন্দি/বাংলা চলচ্চিত্র বরসাত কি এক রাতের মতো কয়েকটি প্রধান সফল খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, উৎপল দত্ত ছিলেন অমিতাভ বচ্চনের প্রথম উদ্যোগ সাত হিন্দুস্তানির নায়ক (প্রধান প্রধান)।
"বিপ্লবী থিয়েটার মূলত জনগণের থিয়েটার, যার মানে এটি জনগণের সামনে বাজানো উচিত, .."
উৎপল দত্ত[৯] দত্ত আজীবন মার্কসবাদী এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) এর সক্রিয় সমর্থকও ছিলেন,[10] এবং তাঁর বামপন্থী "বিপ্লবী থিয়েটার" সমসাময়িক বাংলা থিয়েটারের একটি ঘটনা ছিল। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে অনেক পথনাটক মঞ্চস্থ করেন। 1965 সালে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার তাকে কারাগারে বন্দী করে এবং কয়েক মাস আটকে রাখে, কারণ তৎকালীন রাজ্য সরকার আশঙ্কা করেছিল যে তার নাটক কল্লোল (তরঙ্গের শব্দ), (1946 সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহের উপর ভিত্তি করে) নাটকটির ধ্বংসাত্মক বার্তা। যা কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে প্যাকড শো চালিয়েছিল), পশ্চিমবঙ্গে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকে উস্কে দিতে পারে। নাটকটি মিনার্ভাতে তার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নাটক হিসাবে পরিণত হয়েছিল। 1968 সালে মানুশের অধিকারে (অফ পিপলস রাইটস), একটি ডকুমেন্টারি ড্রামা হিসাবে মঞ্চস্থ হয়েছিল, এটি আগে বাংলা থিয়েটারে একটি নতুন ধারা ছিল, যদিও মিনার্ভাতে এটি তার গ্রুপের শেষ প্রযোজনা হিসাবে পরিণত হয়েছিল, তারা শীঘ্রই থিয়েটার ছেড়ে চলে যায়। তারপরে, দলটিকে "পিপলস লিটল থিয়েটার" নাম দেওয়া হয়; যেহেতু এটি আরও একটি নতুন দিক নিয়েছিল, তার কাজ মানুষের কাছাকাছি এসেছিল এবং এই পর্যায়টি ভারতীয় স্ট্রিট থিয়েটারকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ তিনি রাস্তার কোণে বা "পোস্টার" নাটকে অভিনয় করতে শুরু করেছিলেন, খোলা জায়গায়, কোন কিছু ছাড়াই। সাহায্য বা অলঙ্করণ, প্রচুর ভিড়ের আগে। এই বছরটি যাত্রা বা যাত্রা পালা, একটি বাংলা লোকনাট্য রূপ, যা মূলত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জুড়ে পরিবেশিত হয়েছিল তার রূপান্তরকে চিহ্নিত করেছিল। তিনি যাত্রার চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন, নির্মাণ ও অভিনয় করেন, এমনকি নিজের যাত্রা দল গঠন করেন। তাঁর যাত্রা রাজনৈতিক নাটকগুলি প্রায়শই উন্মুক্ত মঞ্চে উত্পাদিত হত এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের প্রতীক, এবং আজ তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার।
1970-এর দশকে তার তিনটি নাটক; ব্যারিকেড, দুঃস্বপ্নের নগরী (দুঃস্বপ্নের শহর) এবং ইবার রাজার পাল (এখন রাজার পালা), সরকারীভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভিড় আকৃষ্ট করে।
1963 সালের মস্কোতে নিকিতা ক্রুশ্চেভের সমর্থকদের দ্বারা একজন স্টালিনপন্থী, প্রাক্তন পলিটব্যুরোর সদস্যের বিরুদ্ধে একটি বাস্তব বিচারের ভিত্তিতে তিনি জেলে থাকাকালীন 1964 সালে লৌহা মানব (দ্য আয়রন ম্যান) লিখেছিলেন। এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল আলিপুর জেলে। 1965, পিপলস লিটল থিয়েটার দ্বারা। জেলে থাকা তার বিদ্রোহী এবং রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত নাটকের একটি নতুন সময়ের সূচনা করে, যার মধ্যে রয়েছে টিনার টোলোয়ার (দ্য টিন সোর্ড), আংশিকভাবে পিগম্যালিয়নের উপর ভিত্তি করে, দুশপনার নাগরী (নাইটমেয়ার সিটি), মানুশের অধিকারে (মানুষের অধিকার), স্কটসবোরো বয়েজ মামলার উপর ভিত্তি করে। , স্কটসবোরোর জাতিগত বৈষম্য এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ[ভাঙ্গা নোঙ্গর] 1931 সালের বিচার, সূর্য-শিকার (সূর্যের শিকার) (1978), মহা-বিদ্রোহ (দ্য গ্রেট বিদ্রোহ) (1989), এবং লাল দুর্গো (লাল দুর্গ) (1990) কমিউনিজমের পতন সম্পর্কে, একটি কাল্পনিকভাবে সেট করা হয়েছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশ, এবং জনতার আফিম (জনতার অপিয়েট), (1990) ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির উপর শোক প্রকাশ করেছে লাভের জন্য ধর্মকে শোষণ করা। সব মিলিয়ে তিনি বাইশটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নাটক, পনেরটি পোস্টার নাটক, উনিশটি যাত্রা স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, হাজার হাজার শোতে অভিনয় করেছেন এবং শেক্সপিয়ার, গিরিশ ঘোষ, স্ট্যানিস্লাভস্কি, ব্রেখ্ট এবং শেক্সপিয়ারের গুরুতর অধ্যয়ন লেখার পাশাপাশি ষাটেরও বেশি প্রযোজনা পরিচালনা করেছেন। বিপ্লবী থিয়েটার, এবং শেক্সপিয়ার এবং ব্রেখট অনুবাদ।
এছাড়াও তিনি মেঘ (1961), একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, ঘুম ভাঙার গান (1965), ঝাড় (ঝড়) (1979), ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে, বৈশাখী মেঘ (1981), মা (1983) এর মতো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। এবং ইনকিলাব কে বাদ (1984)। উৎপল দত্ত - অভিনেতা যিনি নিজের একটি অনবদ্য শৈলী তৈরি করেছিলেন
উৎপল দত্ত সর্বদা একটি অপ্রচলিত পথ অনুসরণ করতেন, তা তার ব্যক্তিগত জীবনে হোক, শিক্ষা হোক বা মঞ্চে অভিনয় করার সময়। তার জন্য, অভিনয় কোন কঠোর প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করেনি। অনেকে বিশ্বাস করেন যে অভিনয় হল ভূমিকা, এটি বিভিন্ন আবেগের প্রকাশ, যেখানে আপনি একটি বিশ্বাসযোগ্য ফ্যাশনে মিথ্যা বলেন যাতে দর্শকরা অভিনেতা যা প্রকাশ করেন তা বিশ্বাস করে। এগুলি অভিনয়ের স্বাভাবিক নিয়ম এবং যে কোনও প্রচলিত অভিনেতা এই নিয়মগুলি কঠোরভাবে অনুসরণ করে।
তবে উৎপল দত্ত ছিলেন অন্যরকম। তিনি সর্বদা একটি অপ্রচলিত এবং অনন্য উপায়ে অভিনয়ের এই মূল বিষয়গুলিকে সম্বোধন করেছেন, নিজের একটি অনবদ্য শৈলী তৈরি করেছেন। তিনি কখনই হিস্ট্রিওনিক্স এবং মেলোড্রামায় বিশ্বাস করতেন না। তার জন্য, একজন অভিনেতা মঞ্চে কখনই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না। বরং, দত্ত তার আদর্শিক উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে থিয়েটারকে সম্পূর্ণরূপে কল্পনা করেছিলেন। তাঁর কাছে থিয়েটার ছিল একজন বিদ্রোহীর মতো লড়াই করার অস্ত্র, যিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ করে অর্থনৈতিক সমতায় বিশ্বাস করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি মঞ্চ নির্মাণে একজন অভিনেতাকে অবশ্যই থিয়েটারের সমস্ত উপাদান আয়ত্ত করতে হবে --- যেমন সেট, আলো, শব্দ, মেক আপ, পোশাক, সহ-অভিনেতার ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় অভিনয় দক্ষতা। উৎপল দত্তের প্রতিটি ভূমিকাই তার প্রত্যয়ের
সাক্ষ্য বহন করে। তিনি কখনই তার মঞ্চে উপস্থিতি নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেননি, তবুও
তিনি তার যুগে মঞ্চে সেরা কিছু পারফরম্যান্স দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, মানুশের অধিকারে
স্যামুয়েল লেবোভিৎস-এর চিত্রনাট্য ধরুন, একটি নাটক যা তিনি নিজেই লিখেছিলেন 1931 সালের
বিখ্যাত স্কটসবোরো ট্রায়ালের উপর ভিত্তি করে। এটি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি, হেউড প্যাটারসনের
বিচার সম্পর্কে, যিনি ভিক্টোরিয়া নামে দুই শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত
ছিলেন। দাম এবং রুবি বেটস। স্যামুয়েল লেবোভিৎস ছিলেন প্রতিরক্ষা কৌঁসুলি। এই চরিত্রে
উৎপল দত্তের অভিনয় সবসময়ই অভিনেতা হিসেবে তার সেরা অভিনয় হিসেবে থাকবে। কিন্তু আমি
এসব কেন বলি?
উৎপল
দত্ত বাংলা শব্দ উচ্চারণ করেছেন একটি নির্দিষ্ট ব্যখ্যার সাথে যা মূলত 'স্ট্যাকাটো'
ছিল 'লেগাটো' শৈলীর বিপরীতে, যা সাধারণত ব্যবহৃত হয়। এটি তাত্ক্ষণিকভাবে তার অভিনয়ে
একটি অতিরিক্ত স্মার্টনেস যোগ করে। বিশেষ করে বিদেশি স্যামুয়েল চরিত্রে অভিনয় করার
সময়। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ওয়েস্টার্ন হওয়া উচিত ছিল এবং তার বক্তৃতা প্যাটার্ন
এর সাথে একটি নিখুঁত মিল ছিল। লিবোউইৎস মঞ্চে প্রবেশ করার মুহুর্তে, প্রেস প্রতিনিধিরা
তাকে ঘিরে ধরে এবং প্রশ্ন করা শুরু করে: "আপনি এই জায়গাটি কীভাবে খুঁজে পেয়েছেন
মিস্টার লিবোভিটস?" তিনি উত্তর দেন "ভাল। সূর্যোদয় ভালো। সূর্যাস্ত ভালো।
পুরো জায়গাটা সার্কাসে পরিণত হয়েছে। সে কারণে জায়গাটা সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারিনি।”
আরেকটি
ক্রমানুসারে যেখানে লেইবোউইৎসের স্ত্রী পাথর ছোঁড়ার শিকার হন এবং আহত হন, পুলিশ লেবোউইৎসকে
আশ্বস্ত করে এবং বলে: “কিছুই চিন্তা করবেন না স্যার। আপনার স্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য
আমরা সশস্ত্র পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করেছি।”
লেবোউইৎস
জিজ্ঞেস করে: "তুমি ট্যাঙ্ক আনবে না?"
উৎপল দত্তের এই অনন্য পারফরম্যান্স যারা মিস করেছেন তাদের জন্য সত্যিই অনেক কিছু মিস করেছি। দত্ত যখন মঞ্চে ছিলেন তখন প্রতিটি সংলাপ সহজে তুলে ধরার সূক্ষ্মতা ছিল দেখার মতো। তাঁর সংলাপ পরিবেশনে হাস্যরস এবং গাম্ভীর্যের মিশ্রণ ছিল অনন্য। তিনি এমনভাবে কমিক সংলাপগুলি সরবরাহ করতে পারদর্শী ছিলেন যাতে তারা একটি চিহ্ন রেখে যায় এবং প্রভাব তৈরি করে। একটি গুরুতর পরিস্থিতির জন্য, তার উচ্চারণ এবং প্রবর্তন ছিল প্রথাগতভাবে অনবদ্য। একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যে, সাক্ষী এবং ভিকটিমকে জেরা করার সময়, তার ডায়ালগ ডেলিভারি হাস্যকর হয়ে ওঠে। কিন্তু সারসংক্ষেপ করার সময়, আমরা একজন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত উৎপল দত্তকে দেখতে পাই, যেমন তিনি বলেছেন: “আপনি কি জানেন আমি যখন হেউড প্যাটারসনের দিকে তাকাই তখন আমি কী দেখি? সে আমার শৃঙ্খলিত কালো ভাই।" তার ডেলিভারি আমাদের মার্টিন লুথার কিং এর বক্তৃতার কথা মনে করিয়ে দেয়: "আমার একটি স্বপ্ন আছে যে একদিন আমার কালো ভাই ও বোনদের তাদের ত্বকের রঙ দিয়ে নয়, তাদের চরিত্রের বিষয়বস্তু দ্বারা বিচার করা হবে।"
এই উস্তাদের আরেকটি অনবদ্য অভিনয় হল টিনার তালওয়ারে কাপ্তেন বাবু বেণীমাধব, আধুনিক বাংলা থিয়েটারের একটি ক্লাসিক অংশ। উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত ও মরিয়া পরিচালক বেণী মাধব উৎপল দত্তের সেরা চিত্রায়ন খুঁজে পেয়েছেন। আর কেউ এই চরিত্রের প্রতি সুবিচার করতে পারত না। চরিত্রটির বেশ কয়েকটি শেড ছিল এবং দত্ত অনায়াসে প্রতিটিকে বের করে এনেছিলেন এবং এর সাথে ন্যায়বিচার করেছিলেন। যন্ত্রণা থিয়েটারকে মৃত্যুর হাত থেকে
বাঁচানো, একজন ফুল বিক্রেতাকে একজন শক্তিশালী অভিনেত্রীতে পরিণত করা, আমাদের মনে করিয়ে
দেয় কীভাবে নতি বিনোদিনী নামে একজন পতিতাকে গিরিশ ঘোষ তারকা বানিয়েছিলেন। বেণীমাধব
চরিত্রের মাধ্যমে আমরা আবারও উৎপল দত্তের কমিক রিলিফের অনুভূতি এবং তীব্র অভিনয় দক্ষতার
অনবদ্য দক্ষতা আবিষ্কার করি।
শুধু
মঞ্চেই নয়, এমনকি হৃষিকেশ মুখার্জি, বাসু চ্যাটার্জির মতো প্রখ্যাত পরিচালকদের তৈরি
বেশ কয়েকটি ছবিতে আমরা উৎপল দত্তের কমিক অভিনয় দেখেছি। কিন্তু মানুশের অধিকারে স্যামুয়েল
লেবোভিৎস এবং টিনার তালওয়ারে বেণীমাধবের চরিত্রে তার নাম চিরকাল অমর অভিনেতাদের তালিকায়
খোদাই করবে।
তার
অসাধারণ সুরের গুণাবলী, সূক্ষ্ম মুখের অভিব্যক্তি ছাড়াও উৎপল দত্তকে যা একজন কালজয়ী
অভিনেতা করে তুলেছিল, তা ছিল তার ব্যক্তিত্ব এবং নিঃসন্দেহে তার ক্যারিশমা। তিনি মঞ্চের
আর্ক লাইটের নীচে এবং দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
Legacy
আরব সাগরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় নাবিকদের বিদ্রোহের কাহিনি, যার জন্য তাকে এমনকি কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, ক্লাসিক নাটক কল্লোলের মঞ্চায়নের চল্লিশ বছর পরে, 2005 সালে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে গঙ্গাবক্ষে কল্লোল হিসাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। "উৎপল দত্ত নাট্যোৎসব" (উৎপল দত্ত থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল), অফ-শোর মঞ্চে, কলকাতার হুগলি নদী।
দ্য লাস্ট লিয়ার, 2007 সালের ইংরেজি চলচ্চিত্রটি তার নাটক আজকার শাহজাহানের উপর ভিত্তি করে, একজন শেক্সপিয়রীয় অভিনেতার উপর ভিত্তি করে, এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ কর্তৃক পর্দার জন্য পরিচালিত, পরে ইংরেজিতে শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল।
ব্যক্তিগত জীবন
1960 সালে, দত্ত থিয়েটার এবং চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শোভা সেনকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র কন্যা, বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স, নিউ দিল্লিতে থিয়েটার এবং পারফরম্যান্স স্টাডিজের অধ্যাপক।
মৃত্যু
19 অগাস্ট 1993, [5] তিনি S.S.K.M হাসপাতাল, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাড়িতে ফিরে আসার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান যেখানে তিনি ডায়ালাইসিস করেছিলেন।
পুরস্কার এবং স্বীকৃতি
[সম্পাদনা]
1990 সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ থিয়েটারে আজীবন অবদানের জন্য
শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার- জিতেছেন
1970 ভুবন শোম - ভুবন শোম
ফিল্মফেয়ার সেরা কমেডিয়ান পুরস্কার - জিতেছে
1980 গোল মাল - ভবানী শঙ্কর
1982 নরম গরম - ভবানী শঙ্কর
1984 রং বিরঙ্গী – পুলিশ ইন্সপেক্টর ধুরন্ধর ভাতাওদেকর
বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড: সেরা অভিনেতার পুরস্কার- জিতেছেন
1993 আগন্তুক – মনোমোহন মিত্র
ফিল্মফেয়ার সেরা পার্শ্ব অভিনেতা পুরস্কার - মনোনীত
1975 অমানুষ - মহিম ঘোষাল
1980 গোল মাল - ভবানী শঙ্কর
1986 সাহেব – বদ্রী প্রসাদ শর্মা



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন